সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার এখন প্রায় ৯ শতাংশের কাছাকাছি (৮.৭১%)। তবে বাজারের বাস্তব চিত্র যেন আরও বেশি ভয়াবহ। চাল, ডাল, ভোজ্যতেল থেকে শুরু করে কাঁচাবাজার—সবখানেই আগুন। নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের এই আকাশছোঁয়া দামের কারণে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন সীমিত আয়ের মানুষ। অনেকেই বাধ্য হয়ে দৈনন্দিন খাদ্যতালিকা কাটছাঁট করছেন, যার মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে শিশু ও সাধারণ মানুষের পুষ্টির ওপর। শুধু খাদ্যই নয়; বাসা ভাড়া, যাতায়াত, শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যয় অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় নিম্ন ও মধ্যবিত্তের নাভিশ্বাস উঠেছে।
বাজারের এই অস্থিতিশীলতার পেছনে বৈশ্বিক কারণ যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার চরম ত্রুটি। ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতার কারণে আমদানিনির্ভর পণ্যগুলোর দাম বাড়ছে—এটি সত্য। কিন্তু দেশের ভেতরে উৎপাদিত পণ্যের দাম বাড়ার মূল কারিগর হলো অসাধু ব্যবসায়িক সিন্ডিকেট। অনেক সময় দেখা যায়, বাজারে পণ্যের পর্যাপ্ত মজুত বা বাম্পার ফলন থাকার পরও সরবরাহ চেইনকে জিম্মি করে রাতারাতি পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। মূলত কৃষকের হাত থেকে পণ্য ভোক্তার কাছে পৌঁছানোর মাঝপথে থাকা শক্তিশালী মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণেই দাম কয়েক গুণ বেড়ে যায়।
এই দমবন্ধ করা পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য শুধু সাময়িক জরিমানা বা লোক দেখানো অভিযানই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি সুশাসন ও কার্যকর বাজার ব্যবস্থাপনা।
প্রথমত, যারা মজুতদারি করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে এবং অতি মুনাফার লোভে মানুষের পকেট কাটছে, তাদের ট্রেড লাইসেন্স বাতিলসহ দৃষ্টান্তমূলক আইনি শাস্তির আওতায় আনতে হবে। দ্বিতীয়ত, কৃষক যেন সরাসরি যৌক্তিক দামে ভোক্তার কাছে পণ্য বিক্রি করতে পারেন, দেশজুড়ে এমন আধুনিক ও সরাসরি সরবরাহ ব্যবস্থা (সাপ্লাই চেইন) গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় কৃষি উৎপাদনে জোর দেওয়া এবং প্রান্তিক কৃষকদের জন্য সার ও বীজে পর্যাপ্ত ভর্তুকি নিশ্চিত করা জরুরি।
অন্যদিকে, বাজার স্থিতিশীল রাখতে ভোক্তাদেরও সচেতন হওয়ার বিকল্প নেই। হুজুগে পড়ে প্রয়োজনের অতিরিক্ত পণ্য কিনে মজুত করার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
সব মিলিয়ে, মূল্যস্ফীতির এই প্রবল চাপ থেকে সাধারণ মানুষকে বাঁচাতে হলে সরকারের নীতিনির্ধারণী মহলের কঠোর সদিচ্ছা এবং মাঠ পর্যায়ে তার যথাযথ প্রয়োগ অত্যন্ত জরুরি। বাজার তদারকিতে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ না করলে অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ফেরানো কোনোভাবেই সম্ভব হবে না।