তিনশ বছরের বিশ্বাস ঘিরে লাখো মানুষের মিলনমেলা
নিজস্ব প্রতিবেদক:খুলনার তেরখাদা উপজেলার ছাগলাদহ বাজারে বুড়িমার গাছতলায় অনুষ্ঠিত হয়েছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ঐতিহ্যবাহী মহোৎসব ও দিনব্যাপী বৈশাখী মেলা। মঙ্গলবার (১২ মে) সকাল থেকে রাত পর্যন্ত পূজা-অর্চনা, মানত, সংকীর্তন ও লোকজ মেলার নানা আয়োজনে মুখর ছিল পুরো এলাকা।
স্থানীয় সূত্র জানায়, প্রায় ৩০০ বছর ধরে ছাগলাদহ ইউনিয়নের বুড়িমার গাছতলাকে কেন্দ্র করে এই উৎসবের আয়োজন হয়ে আসছে। প্রতি বছর বৈশাখ মাসের শেষ শনিবার অথবা মঙ্গলবার বসে এ মহোৎসব। স্থানীয়দের বিশ্বাস, এখানে মানত করলে মনোবাসনা পূর্ণ হয়। সেই বিশ্বাস থেকেই দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে ছুটে আসেন হাজারো ভক্ত।
সরেজমিনে দেখা যায়, বিশাল বটবৃক্ষের নিচে স্থাপিত বুড়িমার প্রতিমায় ভক্তরা সিঁদুর মাখিয়ে পূজা দিচ্ছেন। কেউ মিষ্টি, ফিরনি ও প্রসাদ বিতরণ করছেন, আবার কেউ মানত পূরণের আশায় প্রার্থনা করছেন। অনেকে পাশের চিত্রা নদীতে পূণ্যস্নানের মানত করতেও যান।
স্থানীয় বাসিন্দা শ্রীবাস বলেন, “এখানে এসে মানুষ মানত করে। পরে সেই মানত পূরণ হলে আবার এসে বুড়িমাকে উৎসর্গ দেয়।”
এদিকে মহোৎসব ঘিরে বসে বিশাল বৈশাখী মেলা। প্রায় পাঁচ শতাধিক স্টলে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী বিভিন্ন পণ্য বিক্রি হয়। কুলা, ঝুড়ি, বাঁশ ও বেতের তৈরি জিনিসপত্র, হস্ত ও কুটির শিল্পের নানা সামগ্রী ছাড়াও শিশুদের খেলনা ও মিষ্টান্নের দোকানে ছিল উপচে পড়া ভিড়।
মেলায় ঘুরতে আসা শিশু আবু ছাদ বলে, “আমি ছোট বোনের জন্য কিছু জিনিস কিনেছি। অনেক ভালো লাগছে।”
দিনভর ঢাক-ঢোল, করতাল ও বাদ্যযন্ত্রের তালে বুড়িমার জয়গান আর সংকীর্তনে মুখর ছিল পুরো প্রাঙ্গণ। আয়োজকদের দাবি, নারী-পুরুষ, শিশু ও বৃদ্ধ মিলিয়ে প্রায় লক্ষাধিক মানুষের সমাগম হয়েছে এবারের মেলায়।
স্থানীয়দের মতে, বুড়িমা ছিলেন আধ্যাত্মিক জ্ঞানসম্পন্ন এক মহান যোগী মাতা। অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, রোগমুক্তি ও মানুষের মনোবাসনা পূরণের নানা কাহিনি এখনো প্রচলিত রয়েছে এলাকায়। এ কারণে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষ এখানে এসে প্রার্থনা করেন।
উপজেলা পূজা উদ্যাপন পরিষদের সভাপতি ও বুড়িমার গাছতলা কমিটির নির্বাহী সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা অরবিন্দ প্রসাদ সাহা বলেন, “এটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য মিলনমেলা। এখানে সব ধর্মের মানুষ একসঙ্গে অংশ নেন। শান্তিপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠান সম্পন্ন হওয়ায় আমরা আনন্দিত।”
এদিকে আজিজুল বারী হেলালর দিকনির্দেশনায় উপজেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই শান্তিপূর্ণভাবে উৎসব সম্পন্ন হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাহমিনা সুলতানা নীলা ও থানার ওসি মো. শহিদুল্লাহ সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা তদারকি করেন। মেলায় উপজেলা বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারাও উপস্থিত থেকে সার্বিক পরিস্থিতির খোঁজ খবর।